জার্মানির ব্যয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে ইউরোপের প্রবৃদ্ধি?

বহুদিন ধরেই স্থবিরতা, যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা ও রফতানি খাতে চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের অর্থনীতি।

বহুদিন ধরেই স্থবিরতা, যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা ও রফতানি খাতে চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের অর্থনীতি। এমন প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে এসেছে জার্মান সরকারের বড় আকারের ব্যয় পরিকল্পনা। বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালে ইউরোপের প্রবৃদ্ধিতে ফিরবে কিনা, তার অনেকটাই নির্ভর করছে জার্মানির এ ব্যয় পরিকল্পনার ওপর। তবে বিষয়টি নিয়ে যে সবাই একমত এমনও নয়। এ ব্যয় সত্যিই কি ইউরোপের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে, নাকি পুরনো কাঠামোগত দুর্বলতার ভেতরই তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে, এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে তীব্র মতভেদ।

জার্মানির আলোচিত ব্যয় পরিকল্পনার আকার ১ ট্রিলিয়ন ইউরো। ঋণনির্ভর এ ব্যয়ের প্রধান খাত হলো অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা। এ ব্যয় ইউরোপের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে কিনা, সে প্রসঙ্গে এফটির এক জরিপে অংশ নেন ৮৮ অর্থনীতিবিদ। তাদের অনেকে মনে করেন, বার্লিনের ব্যয় পরিকল্পনা ‘ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ’ ঘটাতে পারে। কারো আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এ উদ্যোগের প্রভাব ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেতে পারে।

২০২২ সালের শেষ থেকে মন্দায় আটকে রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানি। শুধু রফতানির ওপর ভর করে দেশটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। এবিএন অ্যামরোর প্রধান অর্থনীতিবিদ নিক কুনিসের মতে, অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদাভিত্তিক পুনরুদ্ধার ঘটাতে ইউরোপে দরকার নতুন বিনিয়োগ ও ভোগব্যয়ে মানসিক উদ্দীপনা তৈরি।

জরিপ অনুযায়ী, ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে ২০২৭ সালে বেড়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছতে পারে। এটি ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) সর্বশেষ পূর্বাভাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

গত বছর বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে ইউরোজোনের অর্থনীতি দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। কিন্তু এ পূর্বাভাস ছিল অতিরিক্ত হতাশাবাদী। বাস্তবে ইউরোপীয় অর্থনীতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। ওই সময় অনেক অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করেছিলেন, সুদহার কমাতে ইসিবি খুব দেরি করেছে। কিন্তু সে আশঙ্কা পুরোপুরি সঠিক ছিল না।

অনেক অর্থনীতিবিদই অনিশ্চিত যে জার্মানির রাজস্ব প্রণোদনা দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ গতি তৈরি করতে পারবে কিনা, নাকি শুধু বৈদেশিক ধাক্কা সাময়িকভাবে সামাল দিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। টিএসি ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ লেয়া দফাস বলেন, ‘প্রশ্নটা সেখানেই’। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতির মধ্যে এক ধরনের ‘টানাপড়েন’ হিসেবে দেখছেন টিডি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক জেমস রসিটার।

আশাবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বছর রাজস্ব প্রণোদনা যোগ হলে ইউরোপের অন্তর্নিহিত স্থিতিশীলতা আরো শক্তিশালী হবে। ২০২৬ সাল নিয়ে আশাবাদী নরডিয়ার প্রধান কৌশলবিদ ইয়ান ফন গেরিখ। তিনি মনে করেন, ‘ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী চমক দেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’

ফিনল্যান্ডের ঋণদাতা সংস্থা ওপি পোহজোলার প্রধান অর্থনীতিবিদ রেইজো হেইস্কানেন আরো বেশি আশাবাদী। তার মতে, ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিগুলো আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বড় ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। আর তা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে ইসিবি। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ আশা করছেন, ২০২৭ সালে মধ্যমেয়াদি ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে।

তবে জার্মানির সক্ষমতা নিয়ে আশ্বস্ত নন জরিপে অংশ নেয়া সবাই। এমইউএফজি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ হেনরি কুক বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী সরকারি ব্যয় জার্মান প্রবৃদ্ধি বাড়াবে ঠিকই। কিন্তু তা কি বৃহত্তর ইউরোপীয় পুনরুদ্ধারে রূপ নেবে?’

সন্দেহবাদীদের আশঙ্কা, বিপুল অর্থ নতুন বিনিয়োগের বদলে কল্যাণমূলক ব্যয় ও অন্যান্য চলতি খাতে খরচ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রভাবও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে সীমিত হতে পারে।

অ্যাবারডিনের অর্থনীতিবিদ ফেলিক্স ফেদার সতর্ক করে বলেন, ‘যারা ২০২৬ সালে জার্মান অর্থনীতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন আশা করছেন, সম্ভবত তারা হতাশ হবেন।’

একই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত ১৫ শতাংশ শুল্ক ও চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বাড়তি চাপে পড়েছে ইউরোপের শিল্প খাতের বড় একটি অংশ। ফলে ভোক্তা আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এবং তারা খরচ করতে অনীহা দেখাচ্ছেন।

এইচএসবিসির ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতিবিদ ফাবিও বালবোনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। তবে আমরা হয়তো মাত্র বরফখণ্ডের চূড়াটুকুই দেখেছি।’

ফরাসি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কারমিনিয়াকের অর্থনীতিবিদ অ্যাপোলিন মেনুর মতে, চীনা রফতানিকারকদের তীব্র প্রতিযোগিতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিল্প খাতকে আরো ফাঁপা করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।

এছাড়া কারো কারো মতে, মার্কিন শেয়ারবাজারের ‘এআই বুদবুদ’ ফেটে গেলে ইউরোপের প্রবৃদ্ধিতেও চাপ আসতে পারে। অ্যালিয়াঞ্জ গ্লোবাল ইনভেস্টরসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিশ্চিয়ান শুলৎস সতর্ক করে বলেন, ‘মার্কিন প্রযুক্তি শেয়ারের মূল্যায়নে তীব্র সংশোধনই এখন সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি।’

তবে কিছু অর্থনীতিবিদ তুলনামূলক আশাবাদী দৃশ্যপটও আঁকছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান অথবা অন্তত একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি।

আরও